Articles

আমাদেও পিয়েতো জানিনি- ব্যাংক লোন ধারায় নব দিগন্তের পথিকৃৎ

হোম মরট্‌গেজ, অটো লোন, ইন্সটল্‌মেন্টের মতো যে বিষয়গুলো আজকের দিনে অহরহ প্রচলিত তা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ইতালীয় অভিবাসীর জনপ্রিয় পুত্র সন্তান। আমাদেও পিয়েতো জানিনি- বন্ধুদের কাছে পরিচিত এপি নামে। তিনি অপেক্ষাকৃত কম সামর্থ্য সম্পন্ন মানুষদের উপর গুরুত্ব আরোপ করে ব্যাংকিং খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন।  জানিনি ১৯৪৯ সালে ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সে সময়ে তার প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক অব আমেরিকা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব্যাংকে পরিণত হয় যার সম্পদের পরিমাণ ছিলো ৭ বিলিয়ন ডলার এবং আমেরিকার ৩০০টি শহরে ৫২৫টিরও বেশি শাখা ছিলো। বর্তমানে জানিনি বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত নির্মাতা এবং ব্যক্তিত্ব হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনে জায়গা করে নিয়েছেন। এই শতাব্দীর তিনি একমাত্র ব্যাংকার বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ  একশ জন ব্যক্তিদের মধ্যে জায়গা করতে পেরেছেন।

ছবিসূত্র: francesdinkelspiel.blogspot.com

জানিনি ১৮৭০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান জোসে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা লুইগি ছিলেন একজন কৃষক যিনি লেগিউর নামের একটি ছোট্ট গ্রামে বেড়ে উঠেছেন। সেই গ্রামটিতে বর্তমানে মাত্র পাঁচশত মানুষ বসবাস করে। তার মা ভার্জিনিয়া ডেমার্টিনি মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তার বাবাকে বিয়ে করেন। আর সে সময়ে জানিনির বাবা, লুইগির বয়স ছিলো ঊনত্রিশ। সৌভাগ্যের সন্ধানে ভার্জিনিয়া ও লুইগি একসাথে বিবেচনা করেই ইতালি ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে আনা সামান্য অর্থ দিয়েই জানিনির মা-বাবা কয়েকটি রুমের এক বাসা ভাড়া করেন। সেই বাসায় ছয় মাস সংস্কার কাজ চালানোর পর তারা বিশটি রুমের একটি কর্মশালা বা সরাইখানায় রূপান্তরিত করে। সেই বিশটি সরাইখানার একটিতেই জন্মগ্রহণ করেন ছোট্ট জানিনি।

পারিবারিক এই সরাইখানার পরিধি দিন দিন বেড়েই চলছিলো যা সময়ের পরিক্রমায় পরবর্তীতে হোটেলে রূপান্তরিত হয়ে যায়। জানিনির বাবা লুইগি কয়েক বছর পর এই হোটেলটি বিক্রি করে ৪০ একর প্লটের একটি জমি কিনে নেয়। ততদিনে এই পরিবারটির স্বপ্নগুলো সত্যি হওয়ার পথে ডানা মেলছিলো। হঠাৎ একদিন লুইগি তার এক কর্মচারীর সাথে সামান্য এক ডলারের ধার দেনা নিয়ে যুক্তি তর্কের শিকার হন এবং শারীরিক আঘাত পাওয়ার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। সাত বছর বয়সী জানিনি নিজের চোখের সামনে তার বাবার মৃত্যু দেখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আর তার মা মাত্র বাইশ বছর বয়সেই বিধবা হয়ে যান।

ছবিসূত্র: ArtAround

পরবর্তীতে ভার্জিনিয়া লরেন্‌যো স্ক্যাটেনাকে বিয়ে করেন যিনি একাধারে কৃষক এবং ছোটখাটো মুদির ব্যবসায়ের উৎপাদনকারী ছিলেন। তিনি তার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই উৎপাদনটি  কৃষি কাজের চাইতে অধিক লাভজনক। এ কারণেই তারা বন্দরের কাছাকছি অবস্থান করার জন্য পুরো পরিবার সহ ১৮৮২ সালে স্যান ফ্রান্সিস্‌কোতে চলে যান। জানিনির বয়স যখন ১৪ বছর ছিলো, তখন তিনি স্কুল ছেড়ে দিয়ে তার সৎ বাবার সাথে কাজে যোগ দেন।

এর থেকে পরের পাঁচ বছর পর্যন্ত জানিনি সেই দোকানের কাজেই নিয়োজিত ছিলো। তিনি মূলত পাবলিক রিলেশনের কাজটিই বেছে নিয়েছিলেন। সম্ভাব্য গ্রাহকদের চিঠি লেখা এবং তাদের সাথে মুখোমুখি সাক্ষাতের কাজ করতেন তিনি। ১৯ বছর বয়সে জানিনির সৎ বাবা তাকে তার কাজের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়ার পুরষ্কার হিসেবে সেই ব্যবসায়ের অংশীদার বানিয়ে দেন। এতে করে জিয়েনিনি লরেন্‌যো এন্ড কোং এর অর্ধেকটা মালিকানা পেয়ে যান। ৩১ বছর বয়সে জানিনি ঠিক করেন যে, তিনি উৎপাদনের সাথে জড়িত এই ব্যবসায় থেকে বেরিয়ে আসতে চান। তাই তিনি জানিয়ে দেন যে, এই ব্যবসায় থেকে তিনি অব্যহতি নিচ্ছেন। তবে কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি যে, জানিনি এতো লম্বা সময়ের জন্য চলে যাবেন। অবশ্য জীবনের এই পর্যায়ে এসেই তার পেশা জীবনের মোড় ঘুরে যায়!

ছবিসূত্র: SFGate

এরপর তিনি হিল্ডজ্‌ বিজনেস কলেজে একটি ছোট কোর্স করার পর স্ক্যাটেনা এন্ড কোং এ কাজে যোগ দেন এবং স্পৃহার সাথে প্রতিনিয়ত কাজ করার দরুন বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া আসা শুরু করেন। আমাদেও পরবর্তীতে এপি নামে পরিচিত পান। তখন থেকেই তার নানান বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়েই বোঝা যেত যে, তিনি ভবিষ্যতে তুখোড় একজন ব্যাংকার হবেন। তিনি লম্বা সময় ধরে কাজ করতেন, চারপাশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে চৌকস ছিলেন এবং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রাহকদের সহযোগিতা করতেন। আর কাজের উদ্দেশ্যে তার এই ঘুরে বেড়ানো এবং কঠোর পরিশ্রমের জন্য তাকে স্ক্যাটেনা এন্ড কোং এর অর্ধেক অংশ দেয়া হয়।

১৯৮২ সালে এই উঠতি ব্যবসায়ী জানিনি বিয়ে করেন ক্লোরিন্ডা অ্যাগনেস কুনেওকে। ক্লোরিন্ডার বাবা নর্থ বিচের সবচাইতে ধনী ব্যক্তি ছিলেন এবং রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায়ে তার ভাগ্য ছিলো সুপ্রসূন্ন। বিয়ের নয় বছর পর্যন্ত জানিনি বিনিয়োগ বা কমিশন নির্ভর ব্যবসায়ে জড়িত ছিলেন এবং সেখান থেকে ত্রিশ বছর বয়সে তিনি অবসর নেন। বই পড়ে আর ঘুরাঘুরি করেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার পুঁজি এবং রিয়েল এস্টেট মিলে এক লক্ষ ডলার (যা তিনি স্ক্যাটেনা এন্ড কোং এর বিক্রয় কমিশন হিসেবে পেয়েছিলেন) দিয়েই তার পরিবার বেশ ভালোভাবেই চলছিলো।

ছবিসূত্র: OCC

১৯০২ সালে তার শ্বশুর মৃত্যুবরণ করেন এবং কলোম্বাস সেভিং এন্ড লোনস্‌ সোসাইটিতে যা নর্থ বিচ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ছোট্ট ব্যাংক ছিলো। জানিনিকে অনুরোধ করা হয়েছিলো সেখানকার বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য। ব্যাংকে কাজ শুরু করার পর তিনি খুব হতাশ হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন যে, ব্যাংক শুধুমাত্র তাদেরকেই লোন দিচ্ছে যারা খুব ধনবান। তিনি চিন্তা করলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক শ্রেণীর নাগরিকেরা হোম লোন, অটো লোন এবং ছোট ব্যবসায়ের লোন থেকে বেশ লাভবান হতে পারে। তাই তিনি অন্যান্য বোর্ড অব ডিরেক্টরদের এই বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। আর সে কারণেই তিনি ১৯০৪ সালে বোর্ড অব ডিরেক্টর পদ থেকে তিনি অবসর নেন এবং কিছু বিনিয়োগকারীদের নিয়ে নিজের ব্যাংক চালু করেন। ব্যাংক অব ইতালি নামের তার এই ব্যাংকটি তিনি চালু করেন তাদের জন্য যাদের প্রয়োজনকে অন্যান্য ব্যাংক উপেক্ষা করে কোন রকম সাহায্যের হাত বাড়াতো না।

ছবিসূত্র: Barbera Foundation

বিশেষ করে, স্যান ফ্রান্সিসকোর নর্থ বিচ সম্প্রদায়ের ইতালিয়ান আমেরিকান শ্রমিক শ্রেণীর প্রবাসীদের লোন দেয়ার এবং অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করেন তাদের লোনের সমান্তরালে শোধ করার ক্ষমতার ওপর নয়, বরং তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। ১৯০৫ সালে তার ব্যাংকে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় সাতশত হাজার ডলার। ১৯০৬ সালে স্যান ফ্রান্সিসকোতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে যে অগ্নিসংযোগ হয় তাতে তার ব্যাংক অব ইতালির বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগেই তিনি ভোল্ট থেকে সব ডিপোজিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একটি ট্রাকে করে নিয়ে আসেন।

এরপর ছোট্ট একটি টেবিল নিয়ে সে ব্যাংকিং কারবার শুরু করেন যেখান থেকে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও তাদের ওপর বিশ্বাসের ভিত্তিতে লোন দেন। আর যারা তার কাছ থেকে সেসময় লোন নিয়েছিলেন, তারা সবাই তার লোন শোধ করে দেন। এছাড়াও তিনি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা খোলার বিষয়টিও তার চিন্তাধারার ফল। ছোট ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার পথিকৃৎও তিনিই। তার মতে, অর্থ কখনো অনর্থক রেখে দেয়া উচিৎ নয়। এপিজি কখনোই খুব বেশি অর্থের পোকা ছিলেন না। তার বেশিরভাগ ব্যাংকই ছিলো কর্মচারীদের মালিকানায় সচল। তিনি তার বেতন ভাতা নিতেন না বললেই চলে। এক বছর, তাকে বেশ বড় অংকের একটি বোনাস দেয়া হয় এবং তিনি সেই অর্থ তৎক্ষণাৎ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় দিয়ে দেন।

Feature Image Source: smartmoney.startupitalia.eu

Source link

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

Copyright © 2018 Do Magazine.

To Top